ফুলহীন সন্ধ্যা তার বাঁধেনি কোমর আজো


আমিনুল ইসলামের কবিতা

 

সরল অভিজ্ঞান

কেবলি দহন নয়, পোড়োজমি নয় সবখানি;
পৃথিবী এখনো জলগর্ভা;
বাড়ছে হলুদ শত-সহস্র পাতায়
তবু ফুলহীন সন্ধ্যা তার বাঁধেনি কোমর আজো
বীর্যহীন হাতে। শকুনী উড়ছে বটে,
ভেসে যায় তারো বেশি হংসমিথুন
মুগ্ধ যুগল-ডানায় মেঘলা বিকেলে
ঊষামুখী মহানন্দার আর্দ্র আকাশে।
সত্য বটে-
ভেঙে পড়ে নভোমুখী প্রাচীন মিনার
তথাপি মানুষ ঠাঁইকামী আপন অন্তরে,
পরিতৃপ্ত বাবুইয়ের নীড় রচে স্বপনের ডালে।

সকীর্তন ছড়ায় তারা নপুংসক কামুকের
বিষাদের ছায়া, শয়তানের ভ্রষ্টবীর্য,
পঙ্কিল আত্মার বমি পূর্ণিমার গায়ে,
দ্যাখো আলোকের প্রার্থনায়
আজো তবু পড়েনিকো সবখানি ছেদ।

ক্ষুধাগর্ভ যে কিশোর বিষণ্ন ভোরের বেলা
কুড়োয় ডাস্টবিনে,
নির্যাস কি শুধু সেই দুর্গন্ধের মুঠ?
নিরন্ন সন্ধ্যায় তার একমুঠো উপার্জন
ক্ষুধাতুর জননীর বিপন্ন দু’হাতে দিয়ে
হয়ে ওঠে নিজগন্ধে আগোচর ফুল;
চেতনা কি নেবে না সুবাস সে ফুলের গাও ছেনে?

বিনাশী ভাঙনে ভাসে উদাসীন স্রোতের শ্যাওলা
পূর্ব জনপদ,
দুলে ওঠে বর্ণমালা,
মুছে যায় স্বরলিপি;
কবিতা কি ভেসে যাওয়া?
ভেসে যাওয়া সবটুকু বসতিবিমুখ?
পুরাতন খুঁটিখড়ে যে কিষাণ তোলে ঘর
পয়স্তি পলিতে,
আউশের তাতাভাতে ওঠে যে ঢেঁকুর,
আমেনার মাতৃবুকে ফুলে যে বলক-
কবিতা কি দাঁড়াবে না সেইখানে
তিষ্টিতে ক্ষণকাল উন্মুল প্রহরে?

একদিন বরেন্দ্রের ভাতের সুঘ্রাণে
সমুদ্র জঙ্গল ভেঙে এসেছিল মুগ্ধপায়ে
তুর্কী-চীন-মগ-আরবি-মঙ্গল-তাতার;
আজো সেই মুগ্ধছাপ গাঙেয় তল্লাটজুড়ে
রয়েছে নিভৃতে; তারাও গিয়েছে নিয়ে
নকশীকাঁথার বুক, যমুনার প্রেম
মধ্যপ্রাচ্যে, মহাচীনে, আফ্রিকার গহীন অন্তরে
সঙ্গোপনে বাতি জ্বেলে
অম্লান আজো তা ঝড়ঝঞ্ঝা রুধি।
কবিতা কি যাবে না সেখানে
খুঁজে নিতে প্রত্নহাতে
ছন্দগর্ভ পথখানি শিলা-ঘাসে ঢাকা?

কেবল ভোঁ-কাটা ঘু্ড্ডি হয়ে উড়বে কবিতা?
আর আমরা জ্বলবো শুধু
ধার করা বোধানলে বিষাদ নগরে?
স্তনিত বটপত্রে চৈত্রসাঁঝে বাজে আজো
প্রান্তরের সুর-
কবিতার হাত ধরে
আমরা যাবো না কেন হৃদয় জুড়াতে?

 

ব্লু মাউন্টেইনে দাঁড়িয়ে

হিমের পাহাড় লুট করে নেয় বাতাসের তাবৎ উষ্ণতা
পক্ষপুটের পুঁজিটা তবু ধরে রাখে ক্ষুদ্র পেঙ্গুইন
আমরা ঘুরছি মালয় হয়ে মেলবোর্ন সিডনি ও সুমাত্রা
আমাদের বুকে পদ্মাপাড়ের কয়েকগুচ্ছ বরেন্দ্রদিন।
নীলপর্বতে বাঁশরী বাজায় সাইমন নামের আদিবাসী
চোখমুখে তার খুঁজে পাওয়া যায় আমাদের চোখমুখ
মইষাল ভাইয়ের এমন বাঁশি আমরাও ভালোবাসি
সাইমন আজ খুলে দিলো বন্ধ-থাকা সেই উৎসমুখ।

 

সুয়েজ খালের ওপর তোমার মুখোমুখি

জীবন ও মরণের ঠিক মাঝখানে তুমি এসে ধরে আছো হাত
যেভাবে সুয়েজ খাল ভূমধ্যসাগরকে বেঁধেছে
লোহিতসাগরের সাথে স্রোতেলা দুহাত বাড়িয়ে তার ।

আমি নেফারতিতির আবক্ষ মূর্তির দিকে চাইলেই
প্রত্নরঙা সেই মুখমণ্ডলে জড়িয়ে যায়
তোমার মুখের প্রভাতসুন্দর আলো;
নীলনদের ঢেউ নিয়ে খেলতে অভ্যস্ত হাওয়া এসে
সেই মুখের উপর ছড়িয়ে দেয় তোমার আলুলায়িত চুল;
সিনাইয়ের সম্ভাবনা ঘেঁষা নেতানিয়াহুদের অগ্নিচোখের
আড়ালে দুটি মুখ রচনা করেছে এক অনন্য উৎপ্রেক্ষা;
সেই উৎপ্রেক্ষার ঠাঁই নেই উত্তর আধুনিক কবিদের
হাতে মাপা সিলেবাসে; হোচট খায় আমার নিজের দৃষ্টিও।

মন বলে, যদি একবার চোখ পড়তো মহামতি দারবিশের,
টমাহক শাসিত আজকের এই পৃথিবী পেয়ে যেতো
‘রিটা অ্যান্ড দ্য রাইফেল’–এর চেয়েও সুন্দর
একটি ত্রিমাত্রিক ব্যঞ্জনার অভিনব প্রেমের কবিতা।

আমি আখেনাতেন বা তুতেনখামুনদের কেউ নই,
তবু ভালোবাসার রাজত্বে তোমার রাজাহীন রানিত্ব
বেশ আনন্দের সঙ্গে মেনে নিয়েছে আমার প্রেমমাতৃক হৃদয়।

দোহাই খাপুর পিরামিডের, দোহাই বিধ্বস্ত গাজার,
তোমার এই সর্বজয়ী প্রেমকে আমি ছড়িয়ে দেবো
কক্ষপথ ধরে ধরে এক দিগন্ত থেকে অন্য দিগন্ত
অভিকর্ষের বর্ণমালায় রচিত পৃথিবীর ভালোবাসার ভাষায়…

 

ইস্তান্বুলের ই-মেইল

আঙ্কারা থেকে সানলিউর্ফা বা হারানোদিনের উর্ফা; অতঃপর ইস্তান্বুল।
উর্ফা শহরে আইয়ুব নবীর প্রেম ও ধ্যানের গুহা; কালের সাক্ষী আইউব
মসজিদও। দেখে এসেছি দুই-ই। তোমার ঠোঁটের মতন পবিত্র নবীর
ইন্দারা; তার পানিও জারে করে নিয়ে এসেছে কেউ কেউ। তবে ‘প্রেম
করেছে আইউব নবী- যার প্রেমে রহিমা বিবি গো’-আবদুল আলীমের
এই গানের সন্দেশ হৃদয়ে ধারণ করে এনেছেন কয়জন-, সেটা তুরস্কের
ইমিগ্রেশান বিভাগও জানে না; আর আসমানি এনএসআই কেরামিন
কাতেবিনের গোয়েন্দা নোটবুক তো দর্শনাতীত। আমার প্রসঙ্গে এটুকু
বলতে পারি: বরেন্দ্রীর আঠালো মন নিয়ে তুমি প্রেমতলীর ঘাট হয়ে
বসে থাকতেই পারো; পশ্চিমা বাতাসে বারবার দোলা সত্ত্বেও সুজন
মাঝির মতো আমি তো ভিটামুখী হাল ধরে রয়েছি আজও। তাই নয় কি?

তুরস্কের লোকজন মাঝে মাঝে বৃক্ষচোখে চায়; বাংলা জানলে হয়তো
বলতো- ঐ যায় ওরা এগারো জন! তো যে যার মতো দেখে নিচ্ছি।
আমরা পুরুষরা দেখছি- ডালিমদানার মতো ঠোঁট, পাকা আপেলের
মতো গাল। মাঝে মাঝে ফাও আরো কিছু; বলা চলে এখানে হাটখোলা
মানুষের হাট– ঝলমলে ও আন্তঃমহাদেশীয়। টিকেট ছাড়াই হাফিজ
মাঝে মাঝে উড়ে এসে জুড়ে বসেন ব্যাকুল হৃদয়ে। আহা তিল! হায়
বোখারা-সমরখন্দ! সেই তিলটা খুঁজছি: এলপিআর-মুখী যৌবন নিয়ে
আমি অবশ্য অতোখানি পারবো না- আর মূল কারণটাও তো তোমার
অজানা নয়। ফাহমিদা, যার কথা সেলফোনেও বলেছি, সে যে কী
দেখে– শেয়ার করে না। বসফরাসের খোলা হাওয়ায় খোলেনি সে
এতটুকু! তার মনজুড়ে করতোয়া আর আঁচলে সুন্দরবন। তবে
সেও যে বহুকিছু দেখে-, সেই প্রাপ্তিসংবাদ সুবহ সাদেকের আভা
হয়ে মাঝে মাঝে ফুটে ওঠে তার মুখে। আর আমাদের কনিষ্ঠতম
সদস্য সাখওয়াত- সে বেচারা তেমন কিছু রেখে আসেনি দেশে,
যেমনটা রেখে এসেছি আমি অথবা আশরাফ; নীল মসজিদে দোয়া
করেও আজ অবধি তার কপালে জোটেনিকো কোনো কিছুই;
লাইনটা ঠিক রেখে তার জন্য একটু দোয়া তো করতেই পারো।

ধুপছায়া বিকেলে আজ শহরের চামলিজা হিল ঘুরে এলাম; নাজিম
হিকমতের ছোঁয়া এমবোস সিলের মতন গেঁথে আছে চামলিজার
আকাশে বাতাসে মাটিতে। চামলিজা তরুণ কবি আর প্রেমিক
জুটিদের অক্সিজেন চত্বর। দারুচিনি দ্বীপের পরী হয়ে এইখানে
উড়ে বেড়ায় কবিতার অশরীরী ডানা; থেকে থেকে মর্মরসাগরের
হাওয়া এসে ফ্লাইটের উষ্ণ ন্যাপকিনের মতো মুছিয়ে দেয় মনপ্রাণ।
তুমিও সঙ্গে ছিলে না-আর ইস্তান্বুলের মেয়েরাও ভীষণ স্মার্ট;
আমাদের কার্দেস মানা সত্ত্বেও তাদের কারো সাথেই এডহক
ভিত্তিতে বন্ধুত্ব করার সুযোগ গড়ে ওঠেনি। পৌষমাস পেয়ে
গিয়ে হাসছো তুমি? আর আমার কিন্তু ঠিক উলটো অবস্থা!

কসমোপলিটান সিটি কাকে বলে- সেকথা বুঝেছি ইস্তান্বুলে এসে।
ইস্তান্বুলের রাস্তায় হা করে দাঁড়িয়ে থাকলেও মর্মর সাগরের হাওয়া
এসে ডলার কিংবা নিদেনপক্ষে তুর্কি লিরা দাবি করে বসে; অবশ্য
তাতে কোনো পুলিশী গন্ধ নেই; খোলা হাওয়ায় ডলারের মায়া কষ্টের
আরেকটি উৎস। স্পাইসবাজারে যাইনিকো; তবে গ্রান্ডবাজারে নাসিমা-
ফাহমিদার সঙ্গে রাত অবধি ছিলাম-আমি এবং আশরাফ; সঙ্গদোষের
সব পেয়ালায় চুমু দিয়ে দেখেছি; কিন্তু আসার সময় যেটা চুরি করে
দিয়েছিলে, সামুদ্রিক ক্ষুধার কবলে পড়েও খরচ করিনিকো তার এতটুকু;
রিটার্ন টিকেটের গায়ে কনফার্মেশনের মতো লেগে আছে তার ঘ্রাণ।
অতএব ফেরত নেয়ার খাতটা চাইলে বিশ্বব্যাংকের ফরমুলায় বড় করেও
নিতে পারো। ফিরবো শীঘ্রই-সঙ্গে নিয়ে প্রগতির অ্যাসেম্বলকৃত
গাড়ির তুল্য নবায়িত হৃদয়, আর তোমার চুমুর প্রতিদ্বন্দ্বী পাঁচটি
প্রেমের কবিতা; আমাদের বসফরাস ব্রিজ লুবনা আর ফতেহ সুলতান
মেহমুদ ব্রিজ সজন; অতএব ভলো থেকো- সারাদিন- সারা রাত- সারাবেলা।

 

সাবিহা- তোমার কাছে 

ইতিহাসের অলিগলি ঘুরে অবশেষে তোমার কাছে পৌঁছেছি সাবিহা,
সেই জন্য বিধাতাকে ধন্যবাদ। আষাঢ়ের নদীতে বানডাকার মতন যখন
আমার শরীরে যৌবনের কানাকানি শুরু, তখনই আমি তোমার কথা
শুনেছিলাম। তুমি নিশ্চয়ই ভোলোনি-তোমার গালের একটি কালো তিলের
জন্য সমরখন্দ আর বোখারা বিকিয়ে দিতে চেয়েছিলেন আমারই পূর্বসূরী
হাফিজ! আশ্চর্য যে সেদিন তুমি তাকে পাত্তাই দাওনি। সেই ঘটনার হুলস্থুল
বাউরি বাতাসের মতন আমার সমস্ত সত্তাকে অস্থির করে রেখেছিল;
তারপর থেকে হাওয়াতাড়িত মেঘের মতন ব্যাংকক-জাকার্তা-মেলবোর্ন-
ম্যানিলার আকাশ হতে আকাশে ছুটেছি আর ভিড়ের মধ্যে ঢুঁ মেরে টমেটো-
কালার যুবতীদের গালে সেই কালো তিলটা খুঁজে দেখার চেষ্টা করেছি।

সাবিহা, অবশেষে ইস্তান্বুলে এসে তোমাকে পেয়ে গেলাম। আমি খুশি, মহাখুশি।
তোমার সোনালি আপেলের মতো গাল, ডালিমদানার মতো ঠোঁট– শীতল
নাকি উষ্ণ তা পরখ করা হয়নি এখনও–যদিও আমি প্রস্তুতি নিয়েই এসেছি।
দ্যাখো–দড়িবাঁধা বাছুরের মতন অস্থির আমার বাসনা। তিল তো তোমার
তেমনই আছে; কিন্তু একি সাবিহা! তুমি তোমার বাদামি ঊরুর জরুল পথের
পশরার মতন উদোম করে রেখেছো কেন? তুমি মুক্তহারা ঝিনুকের মতন
খোলস হয়ে যাওনি তো! আবিস্কারের নোনতা নেশা বুকে নিয়ে বারোশ’ বছর
পৃথিবীর অলিগলি ঘুরে তোমার কাছে পৌঁছে তোমাকে তো এমনটা দেখতে
চাইনি সাবিহা। আমার ভয় হয়– বাণিজ্যবায়ুর প্ররোচনায় তুমি ইস্তান্বুলের
রাউন্ড দি ক্লক ওপেন মার্কেটের মতো হয়ে গেলে কোনো একদিন তুচ্ছতার
সঞ্চয়ে ঢেকে যাবে চামলিজা হিলের চূড়া আর নীল মসজিদের মিনার। গুজবের
প্রগল্ভতায় সেকথা রটিয়ে দেবে বসফরাসের হাওয়া; হয়তো তখন আর কোনো
কবি আমার মতন ভালোবাসার লাগেজ নিয়ে ইস্তান্বুলের যাত্রী হতে আসবে না!

 

তোমাকে দেখার সাধ

আকাশের ভিসা না ফুরোতেই যাবার সময় হলো বঙ্গীয় বিহঙ্গের;
আমিরাত এয়ারলাইনসের অগ্রিম টিকেট পেছনের ঢেউয়ের মতো
তাগিদ দিয়ে যাচ্ছে আর পেছন ফিরে ডাকতেও পারছি না;
হয়তো তুমি এখন বোর্ডিং স্কুলের মেয়েদের তুর্কীয় উচ্চারণে
ইংরেজি পড়াচ্ছো; তারা গিলে খাচ্ছে তোমার কণ্ঠমাধুর্য আর
তোমার সেই সহকর্মী আড়চোখে চেয়ে বিমুগ্ধ হচ্ছে আড়ালে।
আমি শুনছি না তোমার সে কণ্ঠস্বর–দেখছি না ওই হারমোনিয়াম-
অধরের ওঠানামা। শুধু বিশেষণমাখা একটি মুখচ্ছবি পাসপোর্টস্থ
ভিসার মতন জেগে আছে এই বুকে; সে ছবি দেখবে নাকো
তুমি অথবা অন্যকেউ–এমনকি ইমিগ্রেশন বিভাগের লোকেরাও।
সময়ের চাপে হয়তো একদিন আমিও ভুলে যাবো বহুকিছু-
রাজধানীর অসহ্য ভিড় আর প্রভুহীন কোলাহলে স্মরণের বীণা
সাধারও নিরালা পাবো না; তবু তোপকাপি মিউজিয়ামে
সংরক্ষিত নবীর পদচ্ছাপের মতো এ হৃদয়ে গাঁথা থাকবে
সে মুখচ্ছবি। হয়তো-বা পরকীয়া কোনো সাঁঝ বা ভিসাহীন
রাত টুরিস্ট হয়ে ঢুকে পড়লে হৃদয়ে অথবা ঢাকায় কোনো
কাব্যের আসরে হিকমতের কবিতা পড়তে গিয়ে মনে পড়ে
যাবে তোমাকে, জেগে উঠবে তোমাকে দেখার সাধ–,
তখন কি স্বর্গচ্যুত আদমের মতো ছটফট করবো আমি? জানি না।

গতকাল চামলিজা হিলে কাটিয়ে এসেছি এক বিস্মিত দুপুর;
নাজিমের কত মগ্নসাঁঝ কেটেছে এই হিলে! আমি তাঁর
সম্মানে তুরস্কের প্রেমিক-প্রেমিকার জন্য রেখে এসেছি
মর্মরসাগরের বসন্ত-বাতাসের মতো একগুচ্ছ শুভকামনা।
কোনো এক দুপুরে নিশ্চয়ই তুমি চামলিজা হিলে বেড়াতে
যাবে, সাথে থাকবে বাদামিরঙের কোনো তুর্কী যুবক;
তুমি জানবে নাকো সেই হিলে বসে তোমার কথা ভেবেছে
বঙ্গের এক কবি– তার ভালোবাসা কৃষ্ণসাগরের শ্যাওলা
নিঃসৃত অক্সিজেন হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে ইস্তান্বুলের হাওয়ায়।

 

আঁধারের জানালায়

আঁধারের জাল ফেলে জেগে আছে রাতঃ
পৃথিবী এখন শুধু মহা এক গুহা
আধরাত আলো দিয়ে মরে গেছে চাঁদ
লাশ নিয়ে বসে আছে গুটিকয় চুহা।

নদীর স্রোতের সাথে খেলে সারাদিন
ঘুমিয়ে রয়েছে ঘাটে জলের নায়ক
আবহসঙ্গীত রূপে বাতাসের বীণ
বাজিয়ে চলেছে কোন্ অদৃশ্য গায়ক!

বৃক্ষের বাকল চেরা প্রশাখাকে ভেঙে
বের হয়ে ভাঁজ খোলে নবীন পাতারা
মৃত্তিকার আচ্ছাদন প্রাণপণে ভেঙে
সদলে বেরিয়ে আসে ব্যাঙের ছাতারা।

পিঁপড়ারা খুশি পেয়ে খসে পড়া লেজ
সারসীর ডিম পেয়ে খুশি গুঁইসাপ
নিষিদ্ধ পিয়াস চোষে অধরের স্বেদ
তাপদগ্ধ মাটি ছাড়ে কোষবদ্ধ তাপ।

দুঃস্বপ্নের লিঙ্গ টানে ঘুমের শরীর
তাই দেখে শরমিন্দা জোনাকির চোখ
ফ্যানের বাতাসে মিশে গভীর নিবিড়
জানালায় মাথা কোটে বুকভাঙা শোক।

নপুংসকের ঘরে নাক ডাকাডাকি
সেই ফাঁকে পরকীয়া-ঘামে ভেজে ছাদ
অরুন্ধতী জেনে গেছে বিধাতার ফাঁকি
জীবনের পক্ষে হয়ে ডুবে গেছে চাঁদ।

ক্লিনিকের বেডে শুয়ে হার্টের পেসেন্ট
নার্সের নিতম্ব দেখে ঘামছে ভিতরে
ফ্রয়েডের সফলতায় হান্ড্রেড পার্সেন্ট
যমদূত হতভম্ব: এ হয় কী করে!

পেন্টাগনে ক্রিয়াশীল আঁধারের হাত
ডেভিলের ওয়ার্কশপ চালু পুরোদমে
আলোকের ছাদে হবে তামস আঘাত
আণবিক মসলার ঘ্রাণ ওঠে জমে।

সৈন্যদের পাতে যাবে সুরুয়াসমেত
কার মাথা- কার রান- কার পাকস্থলী
শয়তানের খাজিন্দার হাতে নিয়ে প্লেট
জেহোভার সাক্ষী খুশি– হবে নরবলি!

গুয়ান্তোনামোয় থির সূর্যহীন রাতে
সভ্যতা কঁকিয়ে ওঠে বর্বর আঁধারে
শৃঙ্খলিত আর্তনাদ বিপন্ন ভাষাতে
বেজে ওঠে বাদুড়ের বিস্মিত রাডারে।

অবারিত উষ্ণতায় সশস্ত্র মেধার
ষড়যন্ত্র পেকে ওঠে রুদ্ধদ্বার ঘরে
দিন ছিল সাঁঝতক ভাগ ও দ্বিধার
সে-তথ্যও দিয়েছিল নৃপতির চরে।

ঘুমিয়েছে গণতন্ত্র অ্যাফ্রো-এশিয়ায়
হরিণ শিশুর মতো কোমলশরীর
তাই দেখে লোভ জাগে জলে ও ডাঙায়
থাবা আর দাঁত নিয়ে সমান অধীর।

বাদুড়ের পাখনায় সজাগ রাডার
সঙ্কেতের শুদ্ধতায় লক্ষ্য-অভিগামী
পেঁচার নখরে ধরা পড়েছে আহার
প্রকৃতির রণমঞ্চে দৃশ্য মহাদামী।

সবুজের ঘরে শুনে নাকডাকা ঘোর
কুড়াল-করাত মগ্ন পরিকল্পনায়
পাখিদের প্রাণ চায় কাকডাকা ভোর
আঁধারের রাজ্য যেন কালো মাৎস্যন্যায়।

সুনিপুণ জালখানা ঝোলে কড়িকাঠে
পেটে গেছে আহা কত পতঙ্গ ও পোকা
সেই জাল বদলেছে কবরের খাটে
মরণে জীবন খায় জীবনের ধোকা।

ক্লান্তির বেদনা মুছে ঘুমের দু-হাত
বিপন্ন কোমরে গোঁজে মেদের বাহুল্য
কালোবেড়ালের পায় রেডি হয় রাত
ডাস্টবিনে জমে ওঠে কাকের সাফল্য।

রাতের প্রচ্ছদে আঁকা জগতের ছবি
বিধাতার পরাজয়ে উৎসর্গ করা
এই দৃশ্য দেখে নেয় শাপগ্রস্ত কবি
ডিজিটাল ক্যামেরায় যদিও অধরা।

সুবেসাদেকের আলো ফুটবে যখন
ফেরেস্তারা ফিরে যাবে সাতআসমানে
কবি আর শয়তান ঘুমোবে তখন
যমজ ভাইযের মতো একই বিছানে।