পঁচিশ বছর আগে দেখা একটি মুখ


পঁচিশ বছর আগে দেখা একটি মুখ

চলার পথে কত না বিচিত্র ঘটনা আমাদের জীবনে ঘটে। কত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয়। সব ঘটনা কিংবা সব মানুষের কথা কি আমাদের মনে থাকে? কিছু ঘটনা মনের গভীরে দাগ কেটে যায়। কিছু মানুষ মনের ক্যানভাসে ছবি হয়ে মিশে থাকে। এই যেমন জাভেদ কাকার কথাই ধরুন। আমি কি কখনও ভেবেছি এতদিন পর তার সঙ্গে আমার এরকম একটি ঘটনা ঘটবে!

এই যে ফুরিয়ে যাওয়া অগ্রহায়ণ আর সূচিত পৌষের হিম হিম কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে হাসপাতালের নির্জন ক্যাবিনে আমি তার পাশে বসে আছিÑ আমি কিংবা জাভেদ কাকা কেউ কি ভেবেছি যে, এভাবে আবার আমাদের দেখা হবে! আমি তাকে কত খুঁজেছি! খুঁজে খুঁজে কেটে গিয়েছে পঁচিশটি বছর।
এখন শীতকাল। বাংলা বর্ষ পঞ্জিকায় পৌষ ও মাঘ মাস। এ দুই প্রচণ্ড শীত পড়ে। প্রকৃতিতে থাকে হিম হিম শীতলতা। সকালে ঘুম ভেঙে যাবার পরও কম্বলের ওমে দুই হাতে হাঁটু মুড়ে ব্যাঞ্জন বর্ণ‘দ’ এর মতো হয়ে শুয়ে থাকতে আমার ভালো লাগে।

অফিসে যেতে হয় সাড়ে ন’টা থেকে দশটার মধ্যে। সাড়ে ছয়টায়ই এমন ওম জড়ানো বিছানা-কম্বল ছেড়ে দেওয়ার কোনও অর্থ হয় না। বরং ঘুমের সময়টা আরও দুই ঘণ্টা বাড়িয়ে নিতে পারলে লাভ আছে। ওম্খানি ষোলো আনা উপভোগ করা যায়।
সকালবেলা কখনও আমার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় না নীলা। সংসারের টুকিটাকি কাজ নিজেই সেরে নেয় সে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কাজ সেটি হলো বাজার করা। এ কাজটিও নিরলসভাবে করে। আমাদের বাসার সামনের গলির শেষ মাথায় প্রতিদিন সকালে বাজার জমে। নীলা রোজ সেখান থেকে মাছ, তরকারি ও অন্যান্য দরকারি জিনিস-পত্র কিনে নিয়ে আসে। আমাকে কখনও বাজার করার ধকল সইতে হয় না। এ বাড়িতে আসার পর থেকে এ সুবিধাটুকু আমি পেয়ে যাচ্ছি।

সাড়ে আটটার মধ্যে নাশতাতৈরি করে আমাকে একবার বিছানা ছাড়ার তাগাদা দিয়ে যায় নীলা। আমি গোসল ও নাশতা সেরে খবরের কাগজে চোখ বুলাতে বুলাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিই। পত্রিকাটি বেশিক্ষণ পড়া হয় না। শুধু শিরোনামগুলোতে চোখ বুলিয়েই বেরিয়ে পড়ি।
অফিসে পৌঁছাতে বড়জোর বিশ মিনিট সময় ব্যয় হতে পারে। গলির মাথার বাজারটিতে এখন তেমন লোকজন নেই। একটি চা দোকানের পাশ দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে রিকশাটা থেমে যায়। চকিতে সামনে তাকিয়ে এক অশীতিপর বৃদ্ধকে রাস্তার ওপর; পড়ে থাকতে দেখে লাফ দিয়ে রিকশা থেকে নেমে লোকটাকে দুই হাতে টেনে তুলি। কোথাও কোনও চোটটোট লেগেছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করতে করতে রিকশাওয়ালাকে ধমক দিয়ে বলি,‘তুমি কি উনাকে দেখতে পাওনি?’
‘স্যার, উনিই তো ঘুরান খাইয়া আমার রিকশার ওপরে আইসা পরচে। উনার শইল্লে লাগনের আগেই বেরেক করচি। আর এট্টু অইলেই তো…!’

রিকশাওয়ালার বাকি কথাগুলো আমি আর শুনতে পাইনি। বৃদ্ধের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণের জন্য যেন জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছিলাম। সংবিত ফিরে আসে লোকটির মুখ থেকে নিঃসৃত কোঁকানোর শব্দে। তার মুখের দিকে তাকিয়েই আমার জ্ঞান প্রায় হারিয়ে ফেলার অবস্থা হয়েছে। এত বছর পর জাভেদ কাকার সঙ্গে আমার এভাবে দেখা হয়ে যাবে কখনও ভাবিনি। হ্যাঁ, আমি তাকে জাভেদ কাকাই ডাকতাম। জাভেদ কাকার সঙ্গে এভাবে আচমকা দেখা হওয়ায় আমি অবাক হলেও ভীষণ আনন্দিত হয়েছি। পাহাড়ের চেয়েও ভারী একটি পাথর যেন আমার বুকের উপর থেকে নেমে গেছে। কত দিন ধরে বুকের মধ্যে চেপে রেখেছিলাম পাথরটা!
জাভেদ কাকার মুখে কোনও দাড়ি নেই। গোঁফ আর চুলগুলো ঠিক আগের মতোই আছে। কোনও পরির্বতন নেই, পরিবর্তন শুধু রঙে। আগে তার শরীর ছিল শ্যামল বর্ণের, এখন ধব্ধবে সাদা হয়ে গেছে।

জালের একটা থলে ভরে আলু, টমেটো, বাঁধাকপি ও অন্যান্য তরকারি ছিল জাভেদ কাকার হাতে। সেগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। আমার দিকে নজর না দিয়ে সে আলু-টমেটোগুলো খুঁজে বেড়াচ্ছে। এগুলো কিনতেই বোধহয় বেরিয়েছিল। রিকশাওয়ালাকে সঙ্গে নিয়ে আমি রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে যাওয়া আলু-টমেটোগুলো কুড়িয়ে জাভেদ কাকার হাতের থলেটিতে ভরে দেই। জাভেদ কাকাকেও কুড়িয়ে তুলে রিকশায় বসিয়ে হাসপাতালে ছুটে যাই।

তখন আমি গ্রামে থাকতাম। পড়তাম প্রাইমারি স্কুলে। প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় টিফিনের সময়ে আমার একমাত্র ফ্যান্টাসি ছিল হাওয়াই মিঠাই। প্রতিদিন টিফিন টাইমে হাওয়াই মিঠাই খাওয়ার অভ্যাস ছিল আমার। টিফিন হলেই স্কুল মাঠের উত্তরকোণে মেহগনি গাছটির তলে এসে দাঁড়িয়ে ঝুন্ঝুনি বাজাত হাওয়াই মিঠাইওয়ালা। ঝুন্ঝুনির শব্দটা শুনেই বুঝতে পারতাম হাওয়াই মিঠাইওয়ালা এসেছে। হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করত জাভেদ কাকা। টিনে বাক্সের মধ্যে গোলাপি রঙের রঙিন সুতোর মতো একটা আধার ছিল কাচেঘেরা বাক্সে। এক টাকা দিলেই একটা হাওয়াই মিঠাই বানিয়ে দিত। প্রতিদিনই আমি হাওয়াই মিঠাই খাওয়ার জন্য আম্মার কাছ থেকে চেয়ে এক টাকা করে নিয়ে আসতাম।

একবার একসঙ্গে তিনটি খেয়ে টাকা দিতে পারিনি। কারণ আম্মা আমাকে এক টাকার বেশি দিত না। জাভেদ কাকা বাকিতে দিতে লাগল। এমন করে দশ টাকা পাওনা হয়ে গেল সে। আমি আর হাওয়াই মিঠাই খেতে পারি না। আম্মার কাছ থেকে প্রতিদিন যে এক টাকা পাই সেটা দিয়ে ঋণ শোধ করি। হাওয়াই মিঠাই খেতে না পেরে আমি জাভেদ কাকার সামনে গিয়ে অতৃপ্তির ঢেকুর তুলি। তাই দেখে জাভেদ কাকা আমাকে প্রতিদিন বিনে পয়সায় একটা করে হাওয়াই মিঠাই দিতে লাগল। আমি খেতে না চাইলে সে বলে,‘খাও, খাও, যখন টাকা হবে তখন দিও।’
আমার কিশোর মন আনন্দিত হয়ে ওঠে। আমি প্রতিদিন একটা করে হাওয়াই মিঠাই খেতে থাকি। কখনও টাকা দিই, কখনও দিই না।

হঠাৎ বাবা বদলি হয়ে শহরে স্থানান্তরিত হলে আমাকেও গ্রাম ছেড়ে চলে আসতে হয়। শহরের আধুনিক জীবন যাপনে অভ্যস্ত হতে গিয়ে সেই হাওয়াই মিঠাইওয়ালার কথা বেমালুম ভুলে যাই। শুধু হাওয়াই মিঠাইওয়ালার কথা না, একে একে ভুলে যেতে থাকি পলেস্তরা খসেপড়া পুরনো দালানে কাঠের আধভাঙা বেঞ্চে বসে আমার প্রথম পাঠ নেয়া বিদ্যালয়টির কথা। জালিবেত হাতে নামতা পড়ানো সেই বাজখাঁই কণ্ঠস্বরের মোস্তফা স্যারের কথাও ভুলে যাই। যান্ত্রিক যানের ভেঁপুতে ভুলে যাই ফসলের মাঠ থেকে ভেসে আসা শিয়ালের ডাক, অরণ্য আঁধারে জোনাকির সিম্ফনি। ল্যাম্পপোস্টের মাথায় জ্বলজ্বলে বৈদ্যুতিক আলোয় হারিয়ে ফেলি নারিকেল গাছের চিরল চিরল পাতার ফাঁকে জেগে থাকা পূর্ণিমার চাঁদের অবারিত আলোর উন্মাদনা। চেনা অচেনা মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যায় কেরোসিন তেল ও লবণ নিয়ে প্রাক-সন্ধ্যায় হাঁট থেকে বাড়ি ফেরা গ্রামের সেই সব কিষাণ, যাদের নাকের ডগায় লেগে থাকত শীতকালে ঘাসের ওপরে জমে থাকা শিশিবিন্দুর মতো ফোঁটা ফোঁটা ঘাম। আধুনিক হেয়ার স্টাইল সমেত জেলমাখা চুলের ছিপছিপে তরুণীদের কাছে ম্লান হয়ে যায় রঙিন ফিতে দিয়ে মাথার চুল দুই ভাগ করে বেঁধে পাঠশালায় যাওয়া আমার বালিকা সহপাঠীরা।

মিরপুর কিংবা নারায়ণগঞ্জ ক্রিকেট স্টেডিয়ামে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়ে ছক্কা-চারে ণ্ডল্লোড়ে ভুলে যাই সেই সব স্মৃতি- গ্রামে থাকতে যা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকত। শহরে এসে তা হয়ে যায় বিস্মৃতি। তবু মনের আর্কাইভে ভায়োলিন বাজার মতো করে অদৃশ্য কোনও বাঁশিওয়ালা সুর তুলে স্মরণে এনে দিত। বাবার আঙ্গুল ধরে গঞ্জের হাটে গিয়ে হাটের মধ্যস্থলে ডালপালা মেলে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা বুড়ো বটবৃক্ষের তলে লোকজনের সঙ্গে মিলিত হয়ে দাঁড়াতাম। বড় বড় দাড়ি-গোঁফঅলা একজন লোক সাপ-বেজিতে লড়াই দেখাবে বলে নানান কথার ইন্দ্রজালে আমাদের বেঁধে রাখতো। হাটের অন্যান্য উৎসাহী জনতার মতো আমিও অপেক্ষা করতাম। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও সাপ আর বেজির মধ্যে কাক্সিক্ষত সেই লড়াই শুরু করতো না। চামড়ার ব্যাগ থেকে নামিয়ে গাছের শেকড়-বাকড় দিয়েতৈরি নানা রকমের ঔষুধ বিক্রি শুরু করে। আমরা বিরক্ত হয়ে বাড়ি ফিরে আসতাম। আমার স্কুল পড়ুয়া ছেলে তাহাকে এসব গল্প শোনালে চোখ পাকিয়ে এমনভাবে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে যেন রূপকথার গল্প শুনছে। খেলার সাথিরা মিলে বালুচরে খেলাঘর বানানো, পাটকাঠির মাথায় মাদার গাছের আঠা লাগিয়ে পুঁই আর লাউয়ের মাচায় ফড়িং ধরা,চৈতালি দুপুরে তেপান্তরের মাঠে ঘুড়ি উড়ানো, বনে বনে ঘুরে পাখির বাসা ভেঙে ছানা এনে বাড়িতে পোষা, দিঘির জলে ডুবসাঁতার আর জলে নেমে দলবেঁধে জলকেলি করার কথা শুনে তো ছেলে আমার হেসে গড়াগড়ি যায়।

নীলা শহরে বড় হওয়া মেয়ে। সন্তানদের কাছে বলা এসব গল্প শুনে সে মাঝেমধ্যে গ্রামে যাওয়ার বাহানা করে। পেশাগত ব্যস্ততার কারণে আজ অবধি তাকে নিয়ে যাওয়া হয়নি আমার শৈশবের গ্রামে। দেখানো হয়নি সেই সব চরাচরÑ যেখানে আমার বাবা-কাকারা লাঙ্গল-জোয়াল আর গরু দিয়ে হালচাষ করত। শহরের জীবনের ব্যস্ততায় আমি এতটাই জড়িয়ে পড়েছি যে গ্রামের কথা, গ্রামের মানুষের কথা একেবারে ভুলে গিয়েছি। কিন্তু গ্রামের স্মৃতি ভুলে গেলেও জাভেদ কাকাকে ভুলিনি। মাঝেমধ্যে তার কথা মনে পড়ত। সবেচেয়ে বেশি মনে পড়ত হাওয়াই মিঠাই খেয়ে তাকে দশ টাকা দাম দিতে না পারা কথা। পঁচিশ বছর আগের সেই দশ টাকা ঋণ আমার বুকের উপর এতটাই কঠিন-কঠোর হয়ে চেপে বসেছে যে মনে হয়, থাই পাহাড়ের চেয়ে ভারী একটা পাথর বয়ে বেড়াচ্ছি।

‘হাওয়াই মিঠাইয়ের সেই দশ টাকা ঋণ শোধ করতে আপনাকে কত যে খুঁজেছি!’
এ কথাটি বলতেই জাভেদ কাকা ম্লান হেসে বলে,‘তুমি এখনও সেটা মনে রেখেছ? এখন ঋণ শোধ করবা বুঝি?’
আমার চোখে জল নেমে এসেছে। মানুষ দুঃখ ছাড়াও কাঁদতে পারে সেটা জানা ছিল না। আমি পঁচিশ বছরের পুরনো ঋণ শোধ করার সুযোগটা হারাইনি।
ডাক্তার অষুধ-পথ্য লিখে দিয়ে গেছে। আমি ডাক্তারের ফি ও যাবতীয় ঔষুধ কিনে জাভেদ কাকার বাসায় ফোন করে খবরটা দিলাম। জাভেদ কাকার বড় ছেলে মমিনুল বেশ অস্থির হয়ে হাসপাতালে ছুটে এলো। মমিনুলের কাছে আমি জানতে পারলাম, এক সময় যাকে হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করে জীবনযাপন করতে হত সেই জাভেদ আলী এখন দুইজন কলেজ শিক্ষকের পিতা।
সত্যি, কত বিচিত্র ঘটনা ঘটে আমাদের এ জীবনে!