গুচ্ছ কবিতা
নোয়ানো মাথা
বেগতিক বাতাস, বৃষ্টির চাপ বাড়ে
সাথে বাড়ে একটি অসহায় অভিমান।
আসমান ফালি করা বিদুৎ রেখা, নিঃসীম নিস্তব্ধতা,
একটি নোয়ানো মাথা।
একটি ঘুর্ণন পাখা, একটি রকিং চেয়ার, ঘড়ির কাটা।
একটি শূন্য শরীর দুলে দুলে বাতাসে
একাকীত্বের গন্ধ ছড়ায়।
নির্লিপ্ত ডাল হতে বিছিন্ন হতে চায় যৌবনবতী পাতা।
আকুলতার অভাবে কত কত বর্ষা মেঘের ভেতর
ফের ফিরে যেতে চায়।
একটি কুকুর জলের তেষ্টা মেটায় লেম্পপোস্টের জলে।
চাইলে নিজের ভিজে শরীর চেটে মেটাতে পারতো তা,
ঘোলা চোখে চেয়ে চেয়ে ভাবে নোয়ানো মাথা।
আচম্বিত বজ্রে কেঁপে উঠে সঙ্গমরত পাখিরা।
ওই দূরে মেঘাবৃত জানালায় বাতি নিভে গেলে
অন্ধকারে নিজের ছায়া খোঁজে নোয়ানো মাথা।
সবুজ সালাম
ভালোবাসতে এসেছি, ঘৃণা ছড়াতে নয়।
তোমরা যারা ইতোমধ্যে আমার প্রমাণিত শত্রু
তোমাদের জন্য রইল আমার দোয়েলের গান
সবুজ সালাম কাঁঠালের সুবাস শাপলার ঘ্রাণ।
প্রেমে পড়তে এসেছি, তাচ্ছিল্য করতে নয়।
তোমরা যারা অবহেলায় মাড়িয়ে যাচ্ছো আমায়
তোমাদের জন্য রইল আমার বুদ্ধের ক্ষমা
সময় হলে চলে এসো অশোক ছায়ায়, নির্দ্ধিধায়।
মমতায় বাঁধতে এসেছি, ঈর্ষাকাতরতা নয়।
তোমরা যারা ভুগছো তীব্র হিংস্র হিংসা জ্বরে
তোমাদের জন্য আজ আমি শিরিন এবাদি
কেবল নয়,নিয়ে এসেছি তেরেসার আশ্রালয়।
প্রতিবাদ জানাতে এসেছি, আপোষ করতে নয়।
তোমরা যারা অন্ধ হয়ে বন্ধ করেছো হৃদয় চক্ষু
তোমাদের জন্য রইল ম্যান্ডেনার কারাবাস ইতিহাস
চে’এর সাহস ভাসানীর অভাবনীয় লংমার্চ।
হাত বাড়াতে এসেছি গুটিয়ে নিতে নয়
তোমরা যারা দেখাচ্ছো আমায় তিক্ষ্ন নক রক্তচোখ
ভুলেছো মানুষ তুমি,বৃক্ষ পাখি ফুলের মতোই এ ধরায়
তোমাদের জন্য পেতেছি ফুলেল শয্যা হৃদয় মন্দিরায়।
যাদুর বাতাস
একমুঠো মন্দ লাগার গল্প বলি শোন
তখন ছিলো প্রেম পাগল হবার মরশুম।
হৃদয় জগতে আলুটিলা সুরঙ্গের ঘুটঘুটে অন্ধকার
আর খরার তিক্ততা দুই ঠোঁট জুড়ে,
চোক্ষে ভাসমান যমুনা,
কণ্ঠ ভরা আকন্ঠ তরল যন্ত্রণা,
দেহমনে স্নায়ুযুদ্ধের ভারাক্রান্ত মহিমা।
মনেহয় যৌবন এসে ছিল না হয় আমরা
হয়ে গেছিলাম যৌবন।
আমাদের কাজ হলো ডুবে যাওয়া
আর কিছু মনে নেই এখন।
তারপর গল্পেরা খেলা শুরু করে
নদীতে তুফান আসে চাঁদে জাগে পূর্ণিমা,
গাছে ফোটে ফুল পাখিরা দেয় মন্ত্রণা
এরপর…
নদী মরে যায়, শুকায় চাঁদ, ফুল ঝরে যায়,
আর পাখিদের কাটে বিরহী রাত….
আমরা এখন দুজন তখন ছিলাম কুজন।
কাঙাল কন্যে
গত শীতে? না না বহু যুগ আগের
কোনো এক গ্রীষ্মে, ভেবেছিলাম দেবো পদ্মা পাড়ি,
আচমকা সেই সব গ্রীষ্ম-শীতে সংসারে কী যেন
কাজ পড়ে গেলো, হয়তো কারো অসুখ নয়তো পরীক্ষা
এমন কিছু হবে হয়তো, মনে নেই আজ আর সেই সব
আতিপাতি!
অতঃপর গত হয়ে যায় শত শত শীত
গ্রীষ্ম, যাওয়া হয় না, দেখা হয় না পদ্মা মেঘনা
আঁড়িয়াল বিল কালো ঝিল যমুনায় নারী!
ফের ভেবেছি বর্ষা যাপন করবো
কোন এক নদীর ধারে টিনের চালের ঘরে।
অনুনয় করে একটি রাত ঠিক কাটিয়ে আসবো,
বনে নাহয় সমুদ্রে বালিয়াড়ি।
কারা যেন এলো কি যেন সব হলো! বাঁধা পড়লো।
শত শত শ্রাবণ মেঘ হয়ে উড়ে চলে গেলো।
হেমন্ত তো মন্দ নয় আর ফাল্গুন সে তো দারুণ
নিশ্চয় যাবো, শুধু একটি রাত কিংবা একটি
দিন, কাটাবো একা নিঃসীম! সেও ভেবেছিলাম
কোন এক জন্মে! হেমন্ত ফাল্গুন কে আর অপেক্ষা
করে এই শিকল পরা মেয়েটির জন্যে !
আজও কাটাতে পারেনি একটি রাত
কিংবা একটি দিন, নিজের মতো করে
কাঙাল এই কন্যে!
বহুদিন হলো কোনো কবিতা দেখিনা
বহু দিন হলো আমি কোনো কবিতা দেখি না।
বই খুলি, আঙুলের ডগায় লালা ছুঁয়ে
অক্ষরের শরীর স্পর্শ করি, পড়ি
প ফ ব ভ ম, য র ল ং ঃ ৎ
কবিতা কই? কবিতা তো দেখি না।
আমি দেখি না আর শাকান্ন ভোজে তৃপ্ত বাউল।
আতিপাতি করে খুঁজি ঘাসফুল পিঁপড়ে
কাকচক্ষু জল। দোতারার তারে খেলা করা আঙুল।
কোথাও নেই দুগ্ধবতী মেঘ সব জল ভারে
ত্রস্ত ব্যাকুল।
মাঠ ভর্তি রিষ্টপুষ্ট তামাকের খেত
বাড়িগুলো মলিন বধূগুলো গর্ভবতী
সমস্ত বছর।
আমি চোখ মেলে দেখি চোখ বন্ধ করি
ধুলো উড়া পথে হাঁটি উর্ধ্বে তাকাই
আলোর ছিটেফোটা নাই, নাই নক্ষত্র নীল।
বহু বহু দিল হলো আমি কোনো কবি দেখি না।
দেখিনা,
বিড়ি ফুকা কালো ঠোঁট সিঁদুর লেপ্টানো কপাল
কোথাও নাই সুলতানের আঁকা সেই পুষ্ট নারী
বলবান তাঁতী জেলে ধোপা নাপিত কামার কুমোর।
বহু বহু দিন হলো আমি কোনো প্রেমিক দেখিনা,
দেখিনা গোঁসাই, ভজন; বিন্দুতে সিন্দু ধারক সাধন।
বহু দিন হলো আমি কোনো মৃত্যু দেখিনা।
সকলে মরে যায় পশুর মতন।
বহু বহু দিন হলো আমি আমাকে দেখিনা
তোমার ভিতর।

