কবি শব্দটা উচ্চারণ করলেই একটি আলেখ্য মনের উদ্দাম বিস্তৃত মাঠে জলজ্যান্ত প্রতাপে ভেসে ওঠে। যার মোহে কর্পুরের মতো না গলে উপায় থাকে না। বড় অদ্ভুত, বড়ই নান্দনিক সে মোহ। কী যে এক আকর্ষণে তার ভেতরে ছিটকে পড়ি, মিশে যেতে-যেতে সেই জীবন্ত বিস্ফারিত মেলে ধরা মাঠে উড়ে চলি নিরন্তর; ঢেউয়ের সমাগত দু-হাত ধরে।
দূরে দাঁড়িয়ে দেখে যাওয়া তুষ্ট কৃষাণের বুকের উদ্বেলিত হাসিটুকু মুখে উঠে আসতেই কে যেন পেছনে টেনে ধরে। আকাশ থেকে ছিটকে পড়ার মতো বিস্মিত হই, হই হতভম্ব। কবি আমিতো তোমাতেই মিশেছিলাম!
খলখলিয়ে হেসে উঠে। হাসির শব্দটুকু ধীরে-ধীরে অসম্ভব মায়াবী মোহে আচ্ছন্ন করে রাখে। চারপাশটা কেমন অচেনা ঠেকে। চোখ বুজে আসে। ঘুম-ঘুম চোখের সাথে মস্তিষ্কের যথার্থ রতিক্রিয়ায় সুদীর্ঘ কালের সার্থকতায় নাম লিখে রাখে। আমি বিমোহিত, আমি আপ্লুত, আমি তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে-তুলতে তোমাকে জপে যাই তসবি মালায়।
এত কালের উপহাস করা অতৃপ্ত নির্ঘুম রাতগুলো পরাস্ত হতে-হতে আজ মিশে যায় বিস্ময়ে। বুঝতে পারার সামর্থ্য সবার একরকম হয় না। কেউ বৃহৎ বাক্যেও কাউকে বোঝাতে সক্ষম হয় না। কেউ কেউ ছোট্ট কতেক শব্দ থেকেই বুঝে ফেলে। কেউবা আবার আকার-ইঙ্গিতে পৃথিবীর একপ্রান্ত হতে অপর প্রান্তকে বুঝে নেয়।
যে সভ্যতার কথা বলি, আদতে তার ভেতরে কতটুকু সভ্যতা আছে; বিবেকের নিক্তিতে যথাযথভাবে মাপজোক করলে কোনো প্রকৃত বিবেকধারীর এতটুকুও বোঝার বাকি থাকবে বলে মনে হয় না। ধোঁয়াশার তামাটে রঙ কাব্যগ্রন্থের ‘ছায়াকঙ্কাল’ কবিতার কথাই ধরা যাক। কবিতাটিতে কবি রফিকুজ্জামান রণি বলে ওঠেন-‘তারপরও দুপুর রোদের প্রখরতায়/কে যেন আজ ফিসফিসিয়ে বলে/সাপের সামনে গলিত এ দেহ মানুষের অধিক মানুষ’।
আসলেই তো তাই। যে সভ্যতার কাঁধে ভর করে আমরা সময়ের খরস্রোতে ভেসে যাচ্ছি সে সভ্যতার শিরা-উপশিরার রক্তের পরতে-পরতে কত দুঃখ দুর্দশা! কত শ্রম ও ঘামের অবমূল্যায়ন। কত ক্ষোভ, অভিশাপ, মৃত্যু সভ্যতার রক্তকণিকায় দৃঢ়ভাবে মিশে গেছেÑ তা দেহের সাথে প্রাণের সমন্বয়ের মতোই।
বড়ই বিস্ময়! পুঁজিবাদ সভ্যতাই বয়োজ্যেষ্ঠ। গলায়-গলায় ভাব। তারই করতলে ভূলুষ্ঠিত মানবতা। যার মারপ্যাঁচ বড় সুক্ষ। গভীর নিরিখেও চোখ পড়ে না। শুধু ধরা দেয় অনুভবের আয়নায়। নিশ্চুপ বিবেক। প্রতিবাদ খাল-বিল ডোবার জলে জানান দেয়Ñ‘একালের সভ্যতার প্রতিচিত্র এবং মহাকালের ছায়াকঙ্কাল’।
শব্দহীন পৃথিবী কেমন হবে? ভাবতে গেলে ভিনগ্রহের দৃশ্যপট ভেসে ওঠে। আসলে কি শব্দ ছাড়া বাঁচা যায়? যায় বৈকি! হাহাকার বুকে নিয়ে বাঁচা। নারীহীন জীবন আদতে জীবন কি? কিংবা পুরুষহীন নারী? পৃথিবীর অস্তিত্ব যদি অনুভবের স্বাদে জড়াতে হয়, তবে নারীহীন জীবন আদৌ জীবন নয়। যেখানে গঞ্জনার উত্তপ্ত লাভা সংসার ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে, সেখানে সেই উত্তাপে জীবনের জলাঞ্জলির পর যেটুকু অবশিষ্ট থাকে তাহাই তো ভালোবাসা। এখানে প্রণয়টুকু নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ থেকে শেকড়ের মতো বিস্তৃত প্রণয়োপাখ্যান রচনা করে, পৃথিবীকে ভীষণভাবে আঁকড়ে ধরে বলেই আজও অক্ষে-কক্ষে সমতায় পা ফেলে চলেছে।
মূলত নারী পুরুষ, এ বিশাল পৃথিবী, ভালোবাসা, যা কিছুই বলি না কেনÑএকটু গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায়, পৃথিবীর সকল সৃজনের অন্তমূলে কোনো না কোনো নিউটনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার স্মৃতি জড়িত। স্বীকার করুক আর নাই বা করুক, মানব মনের প্রধানতম খোরাক জোগায় বিপরীত লিঙ্গ। সৃজন এভাবেই তো এগিয়ে যায়। এখানে জন্ম একটি মৌলিক সত্য। তারই হাত ধরে চলে মৃত্যু।
পৃথিবীর প্রথম যে খুন মহাকালের ভেতরে জ¦লজ¦ল করছে, তা তো নারীকে ঘিরেই। কত ভ্রাতৃত্ববিচ্ছেদ, কত রক্তপাত নারীর রূপ-লাবণ্যের মোহে। তারপরও নারীই পৃথিবীর সৌন্দর্য, নারীই পৃথিবীর গতিময়তার অর্ধাংশ। ‘ধোঁয়াশার তামাটে রঙ’ গ্রন্থে ‘নারী’ কবিতায় সেটাই চিত্রায়িত করেছেন কবিÑ ‘নারী হাঁটে, ছায়া তার নদীর সমান, পৃথিবীকে দেয় সে ফসলের ঘ্রাণ’।
নারীর ছায়া তো নদীর সমানই। কেননা, একই নারী সময়ের স্রোতধারায় ভেসে যেতে-যেতে ভিন্ন-ভিন্ন বন্দরে ভিন্ন-ভিন্ন সম্পর্কের সুতোয় বাঁধা পড়েন: কখনো স্ত্রী, কখনো মা, কখনো দাদি-নানী। এভাবেই নারীর ভালোবাসার বাঁক ঘুরে বিস্তৃত হতে-হতে একসময় নদীর সমান হয়ে যায়।
যে যার পেশায় নিয়োজিত সেকি তার কাজটাকে রক্তে মিশিয়ে দিতে পেরেছে? হয়তো পেরেছে কিংবা পারেনি। না সংখ্যাটাই বেশি। হ্যাঁ সংখ্যা তো হাতেগোনা। রক্তে প্রোথিত কাজটুকুর আপডেট ভার্সন হয়ে যায়। কারণ, সে কাজ অন্তরাত্মাকে জাগাতে পারে। আর অন্তরাত্মার কাজই হচ্ছে নতুনত্বের উদ্ভাবনের জ্বালানি সরবরাহ করা। অন্তরাত্মার দৃষ্টিতে ইলেক্ট্রো আণুবীক্ষণিক প্রখরতা মেশানো থাকে। অথবা তার চেয়েও কল্পনাতীত প্রখরতা মেশানো থাকে। যার সাথে মানুষের এক ধরনের সরলরৈখিক প্রতিবন্ধকতাহীন সংযোগ থাকে। তাতেই কাজে শৈল্পিকতার নতুন নতুন সংযোজন ঘটাতে সক্ষম হন। সেই দৃষ্টিতে দেখার সামর্থ্য থেকেই তার ‘যমের উপত্যকা’ কবিতাটি রচিত হয়েছে বলে মনে করি। নাইলে, কবি কীভাবে বলতে পারেন, ‘গোরখোদকের বিষণ্ন কোদালে/মৃত্যুর পলিমাটি;/যমের উপত্যকায়/ফলে মৃত শস্য’।
যে কোদাল সমাধি প্রস্তুতিতে সদা জাগ্রত। কতশত মৃত্যুর পলিমাটির ঘ্রাণ শুঁকে-শুঁকে তার বুকে সময়ের ছোট-বড় বালুকণা জমে-জমে বিষণ্নতার পাহাড় গড়ে ওঠে- সে হিসেব একবিংশের ব্যস্ততা নামক শব্দের বহু শৈল্পিক মনের হৃদয়ের কর্ণকুহরে কতটুকুই বা বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে? তবে বর্ণিত কবিতাংশের কবিদের মতো কিছু বিপরীত মেরুর, কিছু স্রোতের বিপরীতে অবস্থানকারী, বিস্মৃত হৃদয়ের কর্ণকুহরে এ সকল ধরা দেয় বলেই আমাদের জানা হয়ে যায় গোরখোদকের কোদালের বিস্তৃত উপাখ্যান।
অনুকূলের প্রচণ্ড প্রতাপে থেকেও, কখনো কখনো কিছু প্রাণের হৃদস্পন্দনের শূন্যতায় বিচলিত হয় পৃথিবী। তবুও আশার বাতিটা চৈতন্যের অতলে মিটিমিটি জ্বলে যায়। কত অনুকূল প্রগাঢ় অনুকূলে মিশে যেতে-যেতে, আশার ম্রিয়মাণ আলোটুকুকে বিস্ময় হতে আরো বিস্ময়ের চোখ ধাঁধানো রূপে জীবন্ত করে তোলে। যার প্রতি আস্থার পারদ পজেটিভে পুরোদমে দণ্ডায়মান থাকে। তাকেই ফেরাতে পারে না কোনো বিশ্বস্ত অশ্রুও। তবুও প্রতীক্ষা, ঋতুবদলের মোড়ে মোড়ে অপেক্ষমাণ, দৃঢ় বিশ্বাসের স্তম্ভ একসময় তলিয়ে যেতেই তার কাক্সিক্ষত অদৃশ্য জীয়নকাঠির স্থান বদল হয়ে জেগে ওঠে! তাতেই অবাক বিস্ময়ে প্রতীক্ষিতের ফাটল ধরা বিশ্বাসে আচানক বাস্তবতার বাজ পড়ে। কবি তাই ‘তামাদি হয়না প্রেম’ কবিতায় উচ্চারণ করেন ‘কিন্তু অদ্ভুত, আশ্চর্য! অবাক বিস্ময়!/সৌরভময় এক বসন্তের ছোঁয়ায়/আবারো সে জেগে উঠল/পেলবস্নিগ্ধ চোখ মেলে বলে উঠল/দীর্ঘশ্বাসের মৃত্যু নেই/তামাদি হয়না প্রেম’।
আসন্ন প্রসবা কুকুর এবং কবিতার একাংশে কবি বলেন, ‘শৈশবে পয়সা হারানোর দুঃখ/কৈশোরে প্রত্যাখ্যাত হওয়া প্রেমকষ্ট/যৌবনে লাবণ্য খোয়ানো আক্ষেপ/ফিরে ফিরে বারে বারে/ধ্বনিত হয় কুকুর আর্তনাদে।’
কী চমৎকার! ক্ষণে ক্ষণে ভাবি, কতটা অমায়িক হলে পাথরও ভেঙে যায়। সহজ নামের কঠিন কথা কতটা সহজে প্রকাশ করা যায়! শৈশবে পয়সা হারানো, কৈশোরে প্রত্যাখ্যাত প্রেম কষ্ট, যৌবনে লাবণ্য খোয়ানোর আক্ষেপের চেয়েও বড় কোন দুঃখ আছে কিনা জানিনা। যদি থেকেও থাকে, তথাপি কবি সহজ করে যে কাঠিন্যকে শৈল্পিক আবহে তুলে ধরেছেন, তাতে অন্য সকল কিছুকে দাবিয়ে বর্ণনাটুকুর আবেদন প্রতিটি পাঠকের অন্তরে চিরকাল জলজ্যান্ত প্রতাপে গেঁথে থাকবে বলে বিশ্বাস করি।
এভাবেই কুকুরের আর্তনাদের ভেতরে অতীত স্মৃতিচারণ করতে করতে, হঠাৎ যেন কবি বর্তমান পৃথিবীর কাপড় খুলে উলঙ্গ করে ধরেন। কুকুরের আর্তনাদের ভেতর মানুষ, মহল্লা, রাত, রাষ্ট্র, পুরো পৃথিবীর আর্তনাদকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। পরিণতিও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। এখানেই কি শেষ? না…। ধ্বংসস্তূপ থেকে অবশেষে সৃষ্টির বীজ অঙ্কুরিত হবার আভাসটুকুও কবিতার শেষাংশে ব্যক্ত করেছেন, ‘আসন্ন প্রসবা প্রাণীর সুতীব্র আর্তনাদ/ক্ষয়, লয় এবং সৃষ্টির উন্মাদনা জড়িয়ে রাখে/’-এই গ্রন্থের প্রতিটি কবিতা অসাধারণ। কবিতাগুলোতে প্রতিটি ক্ষণ, দিক, আবহ, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে তুলে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন কবি রফিকুজ্জামান রণি।

