গুচ্ছ কবিতা: এক মানসী অপ্সরী ভাগ্যবতীকে


 

যামিনী হবে ভোর
(এক মানসী অপ্সরী ভাগ্যবতীকে)

খরস্রোতা স্বচ্ছ তটিনীকে ভালোবেসে তার কাছে যাই
বহতা জলের ধারা সে কি জানে মর্মে মর্মে তাকে চাই।

সুরভিত পুস্পের ভ্রমর গুঞ্জরিত রেনুর রঙিন শতদলে
বিনিদ্র রজনী কেটেছে প্রেমিকের বিষাদ নোনা জলে।

স্নিগ্ধ বিকেল ফুরিয়ে যায় কত দ্রুত স্বর্ণ লাল আভা নিয়ে
অস্বচ্ছ সন্ধ্যা আনন্দ পূর্ণ করেছো তুমি আগর সুগন্ধি দিয়ে।

রাত্রি আরো মধুচন্দ্র দীর্ঘ হবে জানি প্রগাঢ় চুম্বনে চুম্বনে
শিথিল করে দিয়ে কাঁচুলি বন্ধন নিবিড় হবো আলিঙ্গনে।

দোয়েলের শিস শীৎকারে যামিনী হবে ভোর ভূলোকে
সুপ্রাচীন ধ্রুপদী মুদ্রায় রতিরসে চরম পুলকে পুলকে।

 

মানুষের কবি
(কবি প্রিয় মাশরুরা লাকী অকিঞ্চিত ভালোবাসায়)

জানি রাজকন্যা হতে চাওনা তুমি, এ তোমার আরাধ্য নয়
কথামালা দিয়ে সাজিয়ে তোল নিপুণ সরল জীবন
ভালোবাস রেলপথ প্রাচীন স্টেশন, খুব যাত্রী নেই আজ
নিঃসঙ্গতা শিল্প হয়ে যায় আধোষ্ণ সিক্ততায়-
ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাও সব স্পর্শে, মায়াবী চোখের তারায়।

কখনো দূরে চলে গিয়ে এক বিন্দু রঙের প্রকাশে
আমি বিন্দু লক্ষ্য করে শুধু সন্ধান করি প্রার্থনায়
দিবস রজনী এখন আর থাকে না চিন্তায়-
তবু স্মরণের উদগ্র আকাক্সক্ষায় তুমি ছিলে গতকাল
শাহজাদী, মহীয়সী সম্রাজ্ঞী কল্যাণময়ী বিদুষী প্রজ্ঞায়।

ঠিক শ্বেত শুভ্র নয়, ননী শুভ্র স্নিগ্ধ উজ্জ্বলতায়
ঘণ কুঁচির ঢেউ তোলা ম্যাচকরা ব্লাউজ শাড়ী
উজ্জ্বল জোড়া মুক্তা বসানো কারুপূর্ণ কণ্ঠহারে
গাঢ় মেজেন্টা ড্্রাই লিপস্টিকে, একবার ভাবি বলি…
এত শুষ্কতা কিছুতেই যায়না তোমার সাথে প্রিয়

আবার ভাবি থাক, ব্যথা জমে জমে কালো-
মেঘ হয়ে জমে ওঠা জ্যোৎস্নায় ছলছল দুটি আঁখি।
তোমার হাত পরশ বুলিয়ে যাচ্ছিল পুষ্প পবিত্র শিশুদের
কোমল কপোল, আর্ত পিড়ীতের অসুখী অন্তস্থল
কত দরদ বিগলিত মর্মব্যথি তোমার তনু মন
কোন উঁচু প্রাসাদের দর্পচূর্ণ করে তুমি নেমে আস
ছায়াবীথি তলে, গ্রন্থ কাননে আবহমান কবিতার মেলায়…

শাহজাদি, সম্রাজ্ঞী হতে চাওনা জানি তুমি
ননীশুভ্র উজ্জ্বলতায়, সন্ধ্যার দীপাধারে
ছড়িয়ে অক্ষর পাঠের অমূল্য জ্যোতি বিভা
তুমি শুধু হতে চাও মানুষের কবি নিগূঢ় বাসনায়।

 

বৃষ্টি ভেজা দিনে

ঝিরিঝিরি মিহি মিহি মিষ্টি মিষ্টি বৃষ্টি ভেজা দিনে
আহা, আজ ছাতা নেই হাতে অলিগলি ফুটপাতে
রাজপথে লেন বাই লেনে বৃষ্টি আজ সারাদিনে
মিহি মিহি ঝিরি ঝিরি ঝরে বৃষ্টি শুধু বৃষ্টিবৃষ্টি
ভিজে ভিজে কাকভেজা একা একা ঘুরে ফিরি অকারণে

এই বুঝি থেমে গেলো জল! হিমহিম বায়ু বয় ক্ষণে ক্ষণে
আজ মন ভালো খুব, কোনো দুঃখ ব্যথা নেই মনে
কথা যদি না-ই বলো, তবে থাক, কী-বা ক্ষতি তাতে?
মিথ্যে অভিমানে রেখো না-তো প্রিয় মুখ ঢেকে
ভালো থেকো, যদি চাও ভুলে যেতে, যেও ভুলে একেবারে
ঝরবেনা আঁখি জল ঝরঝর শ্রাবণ আঁধার রাতে।

ভাবি মোড়ে মোড়ে ঘুরে ঘুরে যদি দেখা হয়
জানি নামবেনা তুমি এই বারিসিক্ত দুর্নিবার দিনে
ভালোবাসো বৃষ্টি, বৃষ্টি প্রেমী তুমি, বৃষ্টি ছুঁয়ে দিলে
খুব ভয় লাগে মনে ঠাণ্ডা জ্বর যদি ফ্লুতে পেয়ে বসে
শুয়ে শুয়ে জানালায় চোখ রেখে মেঘের খিলানে
কামনায় একা একা অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠো গোপন গহনে।

আবার যে শুরু হলো জল ঝরা একটানা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি
রাজপথে ফুটপাতে অলিগলি কানাগলি ডেড লেনে
মতিঝিল থেকে শাহবাগে, ভিজে ভিজে কাঁটাবন মোড়
কনকর্ড করিডোর, এলিফ্যান্ট রোড, বাটা সিগনালে
বইপাড়া, দর্জিঘর, ফুডকোর্ট, কফিশপ, গ্রিনলনে
জানি আসবেনা তুমি এমন বাদল ঝরা দিনে।
তবু যদি এসে থাকো সহসাই কোনো তুচ্ছ প্রয়োজনে…

যদি কাছাকাছি মুখোমুখি হই একপলকের অনুক্ষণে
টুপটাপ, রিমঝিম, রুমঝুম, এই বৃষ্টি ভেজা দিনে।

 

উত্তরাধুনিক যাদুবাস্তবতায়

মগ্ন ধ্যানে বসে আছি শতবর্ষী বৃক্ষবেদী মূলে
আঁখি মুদে, বইমেলা কোলাহল চারিদিকে
আলো জ্বলছে, আলো নিভছে খাবার দোকানে ভীড়
কফি স্পটে দীর্ঘ কিউ, পছন্দের বই বিকিকিনি
চুমুকে চুমুকে বসন্তের মৃদুমন্দ হাওয়ায়

আমি মুদিত নয়ানে টেলিপ্যাথি করি তোমায়
আরাধনা বার্তা পাঠাচ্ছি ইথার তরঙ্গে
তাসবীহর জপমালা হয়ে শুধু তোমারই নাম
চলে এসো ভাগ্যবতী তারুণ্য স্পন্দিত মেলায়
নগরের প্রিয় ঝুল বারান্দায়, ফুটপাত, প্রসস্ত সড়কে
সাহিত্যসভায় কবিতা পাঠের আসরে
তপ্তদুপুর উজ্জ্বল সন্ধ্যায় কতদিন দেখিনা তোমায়।

সুমিষ্ট মৃদু কন্ঠস্বর মাদকতা ছড়ায় যেনো
প্রাচীন কোনো মুদ্রার রাগ অবিরাম মধুর সন্তুর
প্রগাঢ় লাল ড্্রাই লিপস্টিকে, আই শেড
মাশকারা, আই লাইনে আঁকা আঁখি
শতসহস্র বসন্তের পাখি
বিহার মৈথুনে ভেসে বেড়ায় তোমার দৃষ্টির গভীরে।

আমি ধ্যানে বসে আছি শতবর্ষী বৃষ্টি বৃক্ষতলে
যাচনা করি, বাসনা করি, প্রার্থনা করি
চলে এসো লক্ষ্মীসোনা প্রেরণা প্রজ্ঞা হয়ে
ধ্যানভঙ্গ হলে দেখি আচানক মূর্ত হয়ে
উঠেছ তুমি প্রতিটি গ্রন্থ বিপণিবিতানে
ঝলমল করে উঠে কালো তাঁতে স্বর্ণপ্রভা
মিল করা কারুময় স্বর্ণপাড় হাফসিল্ক শাড়ী
মেকি সামান্য গহনাগুলো কত অসামন্য
হয়ে আছে লাস্যময় মোহিনী কায়ায়।

আজ্ঞাবহ দৃষ্টির বৈভবে সুন্দরের একাগ্র সাধনা
করতলে গাঢ় মেহেদী লোকজ কারুকাজ
রাঙ্গিয়ে তোলা সরু নখগুলো, হালকা হিলে
মসৃণ পায়ের আলতা রাঙ্গা গৌর গোড়ালি
সহসা কোমলমতি একঝাঁক শিশুর আনন্দ ধ্বনি
ছিনিয়ে নিয়ে মগ্নতার অপার অতলান্ত-
মুহূর্ত পলক ফেলেই দেখি তুমি মিশে গেছো
অদৃশ্য হয়ে গ্যাছ উত্তরাধুনিক যাদুবাস্তবতায়

বালক বালিকারা ভাষার গান গাইতে গাইতে
তরতর করে উঁচু আরো উঁচু মঞ্চে উঠে যাচ্ছে..

 

কুলপত্র জলে

আমার ওফাত, ইন্তেকালে সম্ভাষণ জানাচ্ছি বন্ধুগণ
বাড়তি কিছু কুরসি পাতা হয়েছে দহলিজে অন্দরে
অন্তিম যাত্রা সাজানো গোছানো হচ্ছে বিবিধ প্রসাধনে
অসামান্য এক কবিতার শ্বেত শুভ্র নান্দনিক আয়োজন।

কোনো অশুচি অপবিত্রতা থাকবেনা এই বিন্যাসে
দূর দূরান্ত থেকে যারা নিকট আত্মীয় বন্ধু স্বজন
শুভক্ষণে শেষ শোভা যাত্রা প্রাক্কালে কোনো দুঃখ নয়…
ভালোবাসায় মুখরিত গুঞ্জরণে শুধু প্রেমই প্রয়োজন
তাঁরই প্রবল ইচ্ছায় চলেছি নিরন্তর আলোরই দিকে
আমার যা ছিলো স্পর্শ সম্পর্ক সম্পদ মায়া-
অজস্র বন্ধন পিতা মাতা স্ত্রী পুত্র কন্যা জায়া
ছিন্ন হলো জাগতিক সব যত সশব্দ বিচরণ।

এক অনুকণা বায়ু খাদ্য আলো জল-
আর অবশিষ্ট নেই যখন এই প্রাণ প্রদীপ সমীপে
বহুবর্ণ দীপ শিখা নিভে গ্যাছে জানি তখনই
কবোষ্ণ কুলপত্র জলে অন্তিম স্নান সমাপনে
নতুন কাপড় সুগন্ধি সুরভি ছড়াবে আতর লোবানে
যাত্রা শুরু হবে এখনই রোদ বৃষ্টি কিংবা ঝড়ে…

সংসার মোহ চরাচরে যা ছিলো ভুল, অন্য আচরণ
ক্ষমার মহিমা যাচি বন্ধু প্রতিবেশী আত্মীয় স্বজন।